সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, বিবিধ

বৃহস্পতিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৩

ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা


যা আমাদের ধারণ করে তা-ই আমাদের ধর্ম। যা ধারণ করলে সমাজ ও ব্যক্তির মঙ্গল হয় তাকে ধর্ম বলা হয়। সত্যিকার অর্থে ধর্ম কল্যাণকর, শুধু মানুষের জন্য নয় সমগ্র পৃথিবীর জন্যই হিতকর, মঙ্গলকর। পৃথিবীতে যত প্রকার অকল্যাণকর কাজ হয়েছে তা ধর্মের নামে হলেও সেখানে ধর্ম ছিল না, ছিল অধর্ম। সহিষ্ণুতা, ক্ষমা, চিত্তসংযম, অস্তেও অর্থাৎ চুরি না করা, শুচিতা, ইন্দ্রিয়সংযম, ধী, বিদ্যা,
সত্য ও অক্রোধ - এ দশটি ধর্মের লক্ষণ (মনুসংহিতা, ৬/৯২)। তাই যেখানেই ধর্ম আছে সেখানে হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, নিন্দা ইত্যাদি থাকতে পারে না। জগতের সকল মানুষ এক স্রষ্টার সৃষ্টি, বিশ্বের প্রায় সকল ধর্মই এ বাস্তব সত্যে বিশ্বাসী । তাই একই স্রষ্টার সৃষ্টি হিসেবে পরস্পরের প্রতি তো সহানুভূতি, ভালবাসা ও সৌহার্দ্যবোধ হওয়া উচিত, এখানে হিংসা, নিন্দা, ঘৃণা বা বিদ্বেষের স্থান নেই। কারণ এটি ধর্মের বিপরীত- অধর্ম। যেমন, সহিষ্ণুতা বা ধৈর্য ধর্ম হলে অসহিষ্ণুতা বা ধৈর্য হারানো অধর্ম। অস্তেয় বা চুরি না করা ধর্ম, চুরি করা অধর্ম, সততা ধর্ম, সুতরাং প্রতারণা বা মিথ্যাচার বা লোক ঠকানো অধর্ম । অধর্ম মানুষকে অসৎ পথে টেনে নেয়। ধর্ম তাকে সৎ পথে রাখে । ভগবানই ধর্মের মূল। ভগবানে বিশ্বাস রেখে সৎ পথে চলাই ধর্ম । আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে ধর্ম বিশ্বাস প্রকাশ পায়। যে সব ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাস মানুষের আচার-আচরণ ও কার্যাবলিকে পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সেগুলোর সমষ্টিকে মূল্যবোধ বলা হয়। কোন্ কাজটি করা ভাল বা কোন্ ধরনের জীবন যাপন করা উত্তম তা নির্ধারণ করাই হচ্ছে মূল্যবোধের লক্ষ্য। মূল্যবোধের অবক্ষয় হলে সমাজে নানা ধরণের সমস্যার সৃষ্টি হয়। সমাজে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য, লোকহিতসাধনার্থ কর্ম করতে হয়। শ্রীমদভগবদগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘লোকসংগ্রহমেবাপি সংপশ্যন্ কর্তুমর্হসি’ (৩/১০) অর্থাৎ লোকহিতসাধনার্থে বা লোক রক্ষার দিকে দৃষ্টি রেখেও তোমার কর্ম করা কর্তব্য। কারণ -জ্ঞানী ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ যেরূপ আচরণ করেন, যা প্রামাণ্য বলে গ্রহণ করেন, যে আদর্শ প্রদান করেন, সাধারণ লোকেও তা-ই অনুসরণ করে। কেবল ধর্ম-কর্ম নয়, আচার-ব্যবহার, পোশাক-পরিচ্ছদ, কথা-বার্তা সকল বিষয়েই এ কথা সত্য। তাই জনকাদি জ্ঞানী ব্যক্তিরাও কর্ম করেছেন। ভগবান বলছেন, ‘হে পার্থ, ত্রিলোক মধ্যে আমার করণীয় কিছু নেই , অপ্রাপ্ত বা প্রাপ্তব্য কিছু নেই, তথাপি আমি কর্মানুষ্ঠানেই ব্যাপৃত আছি। আমি কর্ম না করলে আমার দৃষ্টান্তের অনুসরণে সকলে নিজ নিজ কর্তব্য কর্ম ত্যাগ করে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠবে এবং উৎসন্ন হয়ে যাবে। স্বেচ্ছাচারে বর্ণ-সঙ্করাদি সামাজিক বিশৃঙ্খলা অবশ্যম্ভাবী। সামাজিক বিশৃঙ্খলায় ধর্ম-লোপ, সমাজের বিনাশ। তাই আমি বর্ণ-সঙ্করাদি সামাজিক বিশৃঙখলার কারণ হবো এবং ধর্ম লোপহেতু প্রজাগণের বিনাশের কারণ হবো। সুতরাং লোক-সংগ্রহার্থ, লোক-শিক্ষার্থ আমি কর্ম করি, তুমিও তা কর’। (গীতা, ৩/২১-২৪) স্বার্থপরতা, আত্মবাদীতা ইত্যাদি সংকীর্ণ চিন্তা পরিহার করে মানুষের কল্যাণ চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কর্ম করাই ধর্ম। কাজটি ছোট হোক বা বড় হোক সব অবস্থাতেই প্রশংসনীয়। জগতে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত উপনিষদে নীতিজ্ঞানের বহু মূল্যবান উপদেশ দেখা যায়। যেমন, বেদ - অধ্যাপনান্তে আচার্য শিষ্যকে বেদের শিক্ষা বিষয়ক উপদেশ দান করেন- ‘সত্য কথা বলবে । ধর্মানুষ্ঠান করবে। অধ্যয়নে উদাসীন হবে না। মাতাকে দেবতা জ্ঞান করবে। পিতাকে দেবতা জ্ঞান করবে। আচার্যকে দেবতা জ্ঞান করবে। শ্রদ্ধার সাথে দান করবে। অশ্রদ্ধার সাথে দান করবে না । সত্য হতে বিচ্যুত হবে না। কল্যাণজনক কাজে অমনোযোগী হবে না। সম্পদ বৃদ্ধি বিষয়ে অনাগ্রহী থাকবে না। অতিথিকে দেবতার ন্যায় সেবা করবে। ঐশ্বর্য্যের অনুরূপ অর্থাৎ সামর্থ্য অনুসারে দান করতে হয়। বিনয়ের সাথে দান করা উচিত। প্রীতির সাথে দান করা উচিত । এটাই আদেশ, এটাই উপদেশ, এটাই বেদের রহস্য আর এটাই ঈশ্বরাজ্ঞা। এভাবে সমস্ত অনুষ্ঠান করবে আর এ প্রকারেই সব আচরণ করবে। আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক , আধিদৈবিক শান্তি বর্ষিত হোক তোমার জীবনে’। (তৈঃ উঃ ১/১১/৩) আচার্যের নিকট থেকে প্রাপ্ত এসব উপদেশ সুষ্ঠুভাবে প্রতিপালন করলে শিষ্যের পরম কল্যাণ সাধিত হয়। মানুষ ইহ জীবনে শান্তিতে সংসার ধর্ম প্রতিপালন করতে সক্ষম হয়। নৈতিক মূল্যবোধে পরিপুষ্ট ও উজ্জীবিত শিষ্যের প্রার্থনাও উল্লেখ করার মতো যা আজকের দুনিয়ায় অত্যাবশ্যক। ওঁ সহ নাববতু, সহ নৌ ভুনক্তু, সহ বীর্যং করবাবহৈ। তেজস্বি নাবধীতমস্ত্ত, মা বিদ্বিষাবহৈ।। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ।। তৈঃ উঃ ২/১/১ (ব্রহ্ম) আমাদের ( গুরু ও শিষ্য ) উভয়কে সমভাবে রক্ষা করুন; বিদ্যার সুফল প্রকাশ করে আমাদের উভয়কে পালন করুন। আমরা যেন সমান সামর্থ্যবান হই; অধীত বিদ্যা যেন আমাদের উভয়ের জীবনেই তুল্যভাবে তেজোদৃপ্ত হয়; আমরা পরস্পরকে যেন বিদ্বেষ না করি । আমাদের আধ্যাত্মিক (শারীরিক ও মানসিক রোগাদি), আধিভৌতিক (হিংস্র প্রাণি প্রভৃতি-কৃত হিংসাদি) ও আদিদৈবিক (দৈব, প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা) শান্তি হোক। শিক্ষার্থী অনুরূপ প্রার্থনা অন্তরে লালন করলে শিক্ষা সার্থক বলে গণ্য হবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন