সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, বিবিধ

বৃহস্পতিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৩

দেশপ্রেম : কার্তবীর্যার্জুনের দেশপ্রেম


দেশের প্রতি ভালবাসাকে বলা হয় দেশপ্রেম । নিজের দেশের প্রতি মানুষের প্রগাঢ় ভালোবাসা থাকে, থাকে মমত্ববোধ। স্বদেশের প্রতি এই ভালোবাসা ও মমত্ববোধই দেশপ্রেম। দেশপ্রেমও ধর্মের অঙ্গ। শাস্ত্রে বলা হয়েছে- ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।’ অর্থাৎ মা ও মাতৃভূমি স্বর্গের চেয়েও বড়। সুগভীর দেশপ্রেমের আবেগে কবির কন্ঠে ধ্বনিত হয়- ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা।’
এই দেশপ্রেম প্রকাশ পায় কীভাবে? প্রকাশ পায় আমাদের কাজে, আচরণে। দেশ যদি শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন গভীর দেশপ্রেমের আবেগে দেশপ্রেমিকেরা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শান্তির সময়ে দেশের উন্নতির জন্য কাজ করে যান। কর্মেই ধর্মের পরিচয়। দেশের জন্যে কঠোর পরিশ্রমে ও আত্মত্যাগে দেশপ্রেম প্রকাশ পায়। দেশের জন্যে ধর্মযুদ্ধে যদি কেউ প্রাণ ত্যাগ করেন, তাহলে সেই দেশপ্রেমিক অক্ষয় স্বর্গ লাভ করেন। প্রাচীনকালেও অনেকে এমন দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত রেখে অমর হয়ে আছেন। রামায়ণ থেকে এমনি একজন দেশপ্রেমিক রাজার কাহিনী আমরা জানব। কার্তবীর্যার্জুনের দেশপ্রেম চন্দ্রবংশীয় পরাক্রমশালী এক রাজা ছিলেন। তাঁর নাম কার্তবীর্যার্জুন। সহস্রবাহু ছিল তাঁর। একবার তিনি রাজকার্যের ক্লান্তি দূর করার জন্য অবকাশ যাপন করছিলেন। এই সময়ে লঙ্কার রাজা রাবণ এসে তাঁর রাজ্য আক্রমণ করলেন । এ সময়ে ঐ রাজ্যের এক সেনানায়কের সাথে দেখা হলে রাবণ বললেন- আমি কার্তবীর্যার্জুনের রাজ্য অধিকার করে নেব। কার্তবীর্যার্জুনের ঐ সেনানায়ক এ কথা শুনে খুব রেগে গেলেন। তিনি বললেন- মহারাজ কার্তবীর্যার্জুন অবকাশ যাপন করছেন। আপনি এ সময়টাই বেছে নিলেন। কুড়িখানা হাত বলে আপনার বুঝি খুব অহঙ্কার হয়েছে? মহারাজের হাতে পড়লে আপনার দশ মুণ্ড চূর্ণ হয়ে যাবে। সেনানায়কের কথা শুনে রাবণ তার সাথেই যুদ্ধ আরম্ভ করে দিলেন। সংবাদ পৌঁছানো হলো মহারাজ কার্তবীর্যার্জুনের কাছে। শুনে মহারাজ ক্রোধে আগুনের মতো জ্বলে উঠলেন। -কি, আমার রাজ্য আক্রান্ত। দেশমাতৃকা আমার শত্রুর বিষাক্ত নিঃশ্বাসে বিপর্যস্ত। আমি এক্ষুনি যুদ্ধ করতে যাব। এই বলে রাজা কার্তবীর্যার্জুন সোজা যুদ্ধক্ষেত্রে চলে গেলেন। দারুণ যুদ্ধ হলো দু’পক্ষে। এক পক্ষ আক্রমণকারী আরেক পক্ষ আক্রান্ত । দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। পরাজিত হলে দেশ হবে পরাধীন। তাই তারা কার্তবীর্যার্জুনের নেতৃত্বে প্রাণপণ যুদ্ধ করল। অবশেষে জয় হলো কার্তবীর্যার্জুনের। পরাজিত ও বন্দী হলেন রাবণ। স্বর্গেও এই বার্তা রটে গেল। রাবণ বন্দী । রাবণ বন্দী ! কথাটা কানে গেল মহামুনি পুলস্ত্যের । তিনি তখন স্বর্গলোকে থাকেন। সম্পর্কে রাবণ তাঁর নাতি। তাই তাঁর খুব দুঃখ হলো। তিনি তখনই রওনা হলেন, নেমে এলেন কার্তবীর্যার্জুনের রাজসভায়। মহামুনি পুলস্ত্য! - কি সৌভাগ্য আমার । মেঘ না চাইতেই জলের মতো মহামুনির শুভ পর্দাপণ আমার ঘরে। মহামুনি পুলস্ত্যকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন মহারাজ কার্তবীর্যার্জুন। কার্তবীর্যার্জুনের কথায় সন্তুষ্ট হয়ে পুলস্ত্য মুনি বললেন- তুমি দেবতাদের প্রিয়। ত্রিভুবন তোমার যশ কীর্তনে মুখরিত হয়। জান তো, রাবণ সম্পর্কে আমার নাতি হয়। তাকে পরাস্ত করে তুমি বন্দী করে কারাগারে রেখেছ। আমি তার মুক্তি চাই, বৎস। - রাবণ আমার রাজ্য আক্রমণ করেছিল। আমার দেশপ্রেমিক যোদ্ধারা তাকে প্রতিহত করেছে। বললেন কার্তবীর্যার্জুন। শুনে পুলস্ত্য বললেন- - তোমার গভীর দেশপ্রেম আর বীরত্বের কাছে রাবণ পরাজিত হয়েছে। কার্তবীর্যার্জুন অবনত মস্তকে বললেন, আপনি পরম শ্রদ্ধেয় মুনি । আপনি যখন রাবণের মুক্তি চাইলেন, তখন তাকে মুক্তি দিয়ে আমি ধন্য হতে চাই। রাবণ মুক্তি পেলেন এবং বললেন- বীরত্বের খ্যাতির মোহে পররাজ্য আক্রমণ করি। কার্তবীর্যার্জুন, এ এক নেশা .... চুপ করে রইলেন কার্তবীর্যার্জুন। পুলস্ত্য প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে দিলেন। বললেন, - তোমাদের কল্যাণ হোক। অগ্নি সাক্ষী করে কার্তবীর্যার্জুন আর রাবণের সাথে পুলস্তের মাধ্যমে স্থাপিত হলো মৈত্রী। দাদুরা, এবার তাহলে যাই। - বিদায় চাইলেন পুলস্ত্য। কার্তবীর্যার্জুন আর রাবণ সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে মহামুনি পুলস্ত্যকে বিদায় জানালেন। পুলস্ত্য চলে গেলেন স্বর্গে। রাবণ ফিরে গেলেন তাঁর নিজের রাজ্যে। কার্তবীর্যার্জুন চেয়ে রইলেন তাদের গমন পথের দিকে। দূরে চোখে পড়ল শ্যামল শস্যের প্রান্তর । এই আমার রাজ্য , আমার স্বদেশ। আনন্দে-আবেগে ভরে উঠল মহারাজ কার্তবীর্যার্জুনের হৃদয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন