সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, বিবিধ

মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৪

আলোকিত মানুষ আলহাজ্ব মোহাম্মদ বশির মিয়া



আলোকিত মানুষ আলহাজ্ব মোহাম্মদ বশির মিয়া
নির্মল চন্দ্র শর্মা
আলহাজ্ব মোহাম্মদ বশির মিয়া ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হাজী মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া এবং মাতার নাম আলিফজান বিবি। ভাইবোন আটজন হলেও তাঁদের সংসারে সুখের অভাব ছিল না। তাঁর জন্মের দু’বছর পর তাঁর পিতা লন্ডন চলে যান। সেখানে অর্থ উপার্জন করলেও দেশের প্রতি তাঁর টান ছিল। তিনি প্রতি বছর দেশে আসতেন। কিছুদিন থেকে আবার চলে যেতেন।
প্রথাগতভাবে বশির মিয়া নিজ গ্রামের বিদ্যালয়ে (বুরাইয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়) প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে মাত্র বারো বছর বয়সে পিতার সাথে ইংল্যান্ড যান এবং তৎকালীন শিল্প শহর ব্রাডফোর্ড এর ওয়াইক ম্যানর গ্রামার স্কুলে(Wyke Manor Grammar School, Bradford, UK) ভর্তি হন। এখানে ‘ও’ লেভেল উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৬৯ সালে ব্রাডফোর্ড টেকনিক্যাল কলেজে (Bradford Technical Collage, UK) ভর্তি হন। এখানে পড়াশোনা শেষ করে যখন তিনি লন্ডন আসেন তখন ১৯৭১ সাল, মার্চ মাস
মার্চ, ১৯৭১ এ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে তিনি এই যুদ্ধের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন করেন। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বর নির্যাতনের বিরুদ্ধে হাইড পার্কসহ বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধের তহবিল গঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। জন্মভূমির স্বাধীনতার জন্য নানান কাজে তিনি জড়িত হন কিন্তু মন শান্ত হয় না। তাঁর মনে জাগে সশস্ত্রযুদ্ধে অংশগ্রহণের ইচ্ছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ লাভের উদ্দেশ্যে দেশে ফিরে আসেন কিন্তু পাকবাহিনীর দোসরদের নজর এড়িয়ে দেশ ত্যাগ করতে না পারায় তাঁর মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। তবে তিনি দেশে অবস্থান করে নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা করেন।
১৯৭২ সালে মোহাম্মদ বশির মিয়া নিজ উপজেলার শেখের গাঁও গ্রামের ক্বারী আবদুল মসব্বির সাহেবের প্রথম কন্যা মোসাম্মৎ ফাতেমা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭৩ সালে তিনি সস্ত্রীক ব্রাডফোর্ডে চলে যান। অর্থ উপার্জনের তাগিদ অনুভব করেন।
বশির মিয়া সল্ট সল্টওয়্যার স্পিনিং কোম্পানিতে ওয়েবার পদে চাকুরী নেন, বেতন সপ্তাহে ত্রিশ পাউন্ড। শুরু হয় তাঁর নতুন জীবন।  এ কারখানায় চাকুরী করা অবস্থায় তিনি দেশ থেকে আসা অন্যান্য বাংলাদেশী শ্রমিকদের সমস্যা ও দাবি দাওয়া আদায়ে সচেষ্ট হন। এ কারখানায় কর্মরত অন্যান্য দেশের শ্রমিকরাও তাঁর নেতৃত্বের গুণাবলি ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডের ভূয়সী প্রসংশা করতে থাকেন। এখানে কাজ করার সময় তিনি লক্ষ্য করেন, শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশসহ এশিয়া, আফ্রিকা কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষ; যারা অর্থ উপার্জনের জন্য ইংল্যান্ডে এসেছে কিন্তু ইংরেজি ভাষায় ভাল দখল না থাকায় তারা কাজে সুবিধা পাচ্ছে না, প্রতারিত হচ্ছে। তিনি জাতীয় চেতনা থেকে আন্তর্জাতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হলেন।  ‘মানুষ মানুষের জন্য’, তাই ত স্বেচ্ছায় তিনি ইংরেজি না জানা ঐসব যুবকদের ওয়েভিং শিক্ষাদানে এগিয়ে আসেন। ফলে অতি অল্পদিনের মধ্যেই তিনি তাঁর স্পিনিং কারখানায় একজন শ্রমিক নেতা হিসেবে সকলের শ্রদ্ধার পাত্র ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেন । চাকুরির পাশাপাশি  নিঃস্বার্থভাবে তিনি ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত একাজে ব্রতী ছিলেন।
১৯৭৯ সালে বশির মিয়া মাত্র পঁচিশ বছরের তরুণ, ছাদ মিয়া ও আব্দুর রউফ নামে তাঁর দুই চাচাতো ভাইকে অংশীদার করে তিনি তাঁর স্বাধীন ব্যবসায়িক জীবনের সূচনা করেন  তাঁরা গড়ে তোলেন ক্লিথর্পে তাঁদের প্রথম ভারতীয় রেস্টুরেন্টআগ্রা একজন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন তাঁর সততা, নিষ্ঠা, ধৈর্য, অধ্যবসায়, মেধা ও মনন ব্যবসায় তাঁকে সাফল্য এনে দিয়েছে ছোটবড় সকল কর্মচারীর সুযোগ-সুবিধার প্রতি তিনি সদা যত্নবান কারণ তিনি শুধুমাত্র লাভের আশায়ই ব্যবসা করেন না, তাঁর কর্মযোগ্য মূলত মানবকল্যাণে নিবেদিত আবার রন্ধন শিল্পেও তিনি সিদ্ধিলাভ করেছেন তিনি পাচকবিদ্যা তথা রন্ধন শিল্পের একজন আন্তর্জাতিক মানের শিল্পী ব্যবসার সাফল্যের সাথে সাথে তিনি একের পর এক নতুন রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত উল্লেখযোগ্য রেস্টুরেন্ট হল, নিউ আগ্রা (১৯৮২), হেলাল রেস্টুরেন্ট (লাউথ, ১৯৮৫), আশা রেস্টুরেন্ট (ইমিংহাম, ১৯৮৯), বোম্বাই রেস্টুরেন্ট (ক্লিথর্প, ১৯৯০), শাহীমহল (গ্রিমসবি, ১৯৯২), হেলাল টেইকওয়ে (লাউথ, ১৯৯৩), শাপলা রেস্টুরেন্ট (লাউথ, ১৯৯৫), সিকো সুপার মার্কেট এন্ড ক্যাশ এন্ড কারি স্কানথর্প, ১৯৯৮)
ব্যক্তিজীবনে মোহাম্মদ বশির মিয়া একজন সুখী মানুষ দুটি সন্তানের জনক পুত্র ফখরুল আলম রুহেল আর কন্যা সাহেদা খানম শাহী- দুজনেই গ্রাজুয়েট পুত্র, পিতার ব্যবসায় সহযোগিতা করছেন আর কন্যা সরকারি চাকুরে উভয়ই বিবাহিত
স্পিনিং কোম্পানিতে চাকুরীর সময় দেশি-বিদেশি সহকর্মীদের ভাষা শিক্ষাদানের মাধ্যমে সমাজ হিতৈষণার যে চেতনায় মোহাম্মদ বশির মিয়া উদ্বুদ্ধ হন তা সেখানেই থেমে থাকে নি; তার বিশাল কর্মকাণ্ডের কিছু  বিবরণ এখানে তুলে ধরা হল; যে কাজের মাধ্যমেই আমরা আলোকিত মনের মানুষ বশির মিয়াকে পাই বশির মিয়ার অন্যতম অসাধারণ কাজ বিলেতে প্রতিষ্ঠিতবাংলাদেশ ব্যুরিয়েল সোসাইটি বর্তমানে যার  একটি বড় তহবিল গঠিত হয়েছে এই অর্থের সাহায্যে বিলেতে অসহায় মানুষের লাশ দাফন করা হয় অথবা লাশ দেশে পাঠাতে চাইলে এর ব্যয়ভার বহন করা হয় এ লাশ যে কোন দেশের যে কোন ধর্মের মানুষের হতে পারে এ অক্ষয়কীর্তি স্থাপন করে বশির মিয়া জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের অকৃত্রিম শ্রদ্ধাভাজন হয়ে উঠেছেন
ব্যক্তিজীবনে বশির মিয়া একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ তিনি ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে পবিত্র হজ্বব্রত পালন করেছেন তাঁর বিলেতের বাসভূমি ক্লিথর্পে এর আগে কোন মসজিদ ছিল না অথচ এখানে কেবল বাংলাদেশের নয়, এশিয়ার অন্যান্য দেশের অনেক মুসলমান এখানে বাস করেন সকলের ধর্ম পালনের সুবিধার জন্যই তিনি ক্লিথর্পে বাংলাদেশ সেন্টার ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন শুধু বিলেতেই নয় বাংলাদেশেও তিনি বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসার উন্নয়নে অকাতরে অর্থ ব্যয় করে চলেছেন তিনি একজন দাতা ও সমাজসেবী বিভিন্ন সময়ে তিনি রাস্তাঘাটের উন্নয়নেও অর্থ ব্যয় করেছেন ও করছেন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও তিনি জড়িত রয়েছেন তিনি বাংলাদেশ কালচারাল সোসাইটি, ক্লিথর্প ইসলামিক কালচারাল সেন্টার প্রভৃতি সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন এর আগে তিনি গ্রেটার সিলেট ডেভেলাপমেন্ট এন্ড ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল (জি এস সি) নর্থ রিজিয়নের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন
সাহিত্য ও সাংবাদিকতার উন্নয়নে মোহাম্মদ বশির মিয়ার অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত হচ্ছে মোহাম্মদ ইলিয়াস আলী সম্পাদিতমাসিক সিলেট দর্পণও বার্ষিক পত্রিকাবীথিকা’, রব্বানী চৌধুরী সম্পাদিতত্রৈমাসিক লন্ডন সমাচার এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ, ভারত থেকে প্রকাশিত ড. হোসেনুর রহমান সম্পাদিত পত্রিকানবীনপত্রপ্রকাশনায়ও তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করছেন তা ছাড়াও তিনি নিজ ব্যয়ে প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েকটি গ্রন্থ এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রব্বানী চৌধুরীরদেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর জীবন ও কর্ম’ (ফেব্রুয়ারি ২০০৫), ‘বিলেতের স্কানথর্প বাঙালি সমাজের ইতিকথা’ (আগষ্ট ২০০৫), ‘নৃপেন্দ্রলাল দাশ সৃজন ও নন্দন’ (আগষ্ট ২০০৫), রব্বানী চৌধুরী সম্পাদিতসিলেট বিভাগের গবেষক ও গবেষণা’ (নভেম্বর ২০০৪, ২য় খণ্ড মার্চ ২০০৫, ৩য় খণ্ড জানুয়ারি ২০০৬, ৬ষ্ঠ খণ্ড এপ্রিল ২০০৬), নৃপেন্দ্রলাল দাসের কবিতাগ্রন্থরব্বানী আমার নিজস্ব তর্জা’ (জুন ২০০৫), ‘এই নশ্বরতা চাই’ (ফেব্রুয়ারি ২০০৬), ‘Ode to Rabbani’ (আগষ্ট ২০০৬), ‘কবিতাসমগ্র- ’ (আগষ্ট ২০০৭), গদ্যগ্রন্থদেখা অদেখা’ (আগষ্ট ২০০৬), ‘মধ্যাহ্নের মনন’ (জানুয়ারি ২০০৭), নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামীরসেবা গ্রামে দশদিন’ (নৃপেন্দ্রলাল দাশ ও রব্বানী চৌধুরী সম্পাদিত, জুন ২০০৬) এবং নন্দলাল শর্মারসিলেটের জনপদ ও লোকমানস’ (জুলাই ২০০৬)
এছাড়া মোহাম্মদ বশির মিয়া সম্পাদনা করেছেনকালের কলমে রব্বানী চৌধুরী’ (ডিসেম্বর ২০০৬) নামে চার শতাধিক পৃষ্ঠার একটি বৃহদায়তন গ্রন্থ এবংনৃপেন্দ্রলাল দাশ কবিতাসমগ্র-’ (আগষ্ট ২০০৭)
বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী মোহাম্মদ বশির মিয়া ব্যক্তিজীবনে সদালাপী, বিনয়ী, ভদ্র, নিরহঙ্কারী ও প্রচার বিমুখ মানুষ একজন নীরব কর্মী, নীরব দাতা, জনদরদী, সমাজসেবক তাঁর আলোকিত মনের চিন্তা ও চেতনায় জাতি ও সমাজ আরও ভাস্বর হোক তিনি হোন সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘজীবনের অধিকারী অক্ষয় হোক তাঁর জনহিতৈষী কর্ম
[পুনশ্চ দুটি কথা না বললেই নয়, আলহাজ্ব মোহাম্মদ বশির মিয়া সম্পর্কে আমি তেমন কিছুই অবগত ছিলাম না এক্ষেত্রে শিকড় সন্ধানী লেখক ও গবেষক জনাব মোহাম্মদ সুবাস উদ্দিন নিম্নবর্ণিত পুস্তকসমূহ দিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছেন গ্রন্থসমূহ হচ্ছে-
বশির মিয়া : আত্মিক আশ্রয়, নন্দলাল শর্মা সম্পাদিত, প্রথম প্রকাশ : সেপ্টেম্বর ২০০৭, ঘাস প্রকাশন, সিলেট
একজন বদান্য ব্যক্তির জৈবনিক তৈলচিত্র, নৃপেন্দ্রলাল দাস, জানুয়ারি ২০০৭, বৃন্দবাক, ঢাকা
উদ্যোগী পুরুষসিংহ হাজি বশির মিয়া, বিজনবিহারী পুরকায়স্থ, ২০০৯, উপমা প্রকাশন, ঢাকা
এই নিবন্ধটি রচনায় গ্রন্থসমূহ থেকে আমি অনেক তথ্য ব্যবহার করেছি তাই এই গ্রন্থসমূহের রচয়িতা ও সম্পাদকের প্রতি আমার অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি]
nirmalsharma_61@yahoo.com



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন